Aid Islam LogoAid Islam

বাংলা আর্টিকেল

ইসলামে পিতা-মাতার সম্মান
তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য
প্রায় ১০ মিনিট পঠন
পরিবার, সম্মান, কর্তব্য, জান্নাত
নোটবুক ও কলম

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ইসলাম যে বিষয়গুলোর উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো পিতা-মাতার সম্মান এবং তাদের প্রতি সন্তানের কর্তব্য। ইসলামে পিতা-মাতার স্থান আল্লাহর ইবাদতের পরেই। কুরআন ও হাদিসে বারংবার তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কুরআনের আলোকে পিতা-মাতার মর্যাদা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা তাদের মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। আল্লাহ বলেন:

"আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" (সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩)

এই আয়াতে 'উফ' শব্দটি ব্যবহার করে সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ করতেও নিষেধ করা হয়েছে, যা তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্বকে তুলে ধরে। আল্লাহ আরও বলেন:

"আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন।" (সূরা লুকমান, ৩১:১৪)

এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর নিজের শুকরিয়ার সাথে পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন, যা তাদের অধিকার ও মর্যাদার ব্যাপকতা প্রমাণ করে।

হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অসংখ্য হাদিসে পিতা-মাতার খেদমত ও তাদের সম্মানের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পিতা-মাতার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

"আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন আমল আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, 'সময় মতো সালাত আদায় করা।' আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, 'পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা।' আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, 'আল্লাহর পথে জিহাদ করা।'" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, পিতা-মাতার সেবা করা আল্লাহর পথে জিহাদ করার চেয়েও অগ্রগণ্য। আরেকটি বিখ্যাত হাদিসে আছে, পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত। মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেন, "জান্নাত মায়ের পদতলে।"

এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, "আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, "তারপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করলেন, "তারপর কে?" তিনি আবারও বললেন, "তোমার মা।" চতুর্থবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, "তোমার পিতা।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। এই হাদিসটি মায়ের অধিকারকে পিতার চেয়ে তিনগুণ বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে:

  1. আনুগত্য করা: আল্লাহর নাফরমানি হয় না, এমন সকল বিষয়ে পিতা-মাতার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা সন্তানের জন্য ওয়াজিব।
  2. সম্মান ও ভালোবাসা: তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলা, তাদের সামনে বিনয়ী থাকা এবং মনেপ্রাণে তাদের ভালোবাসা ও সম্মান করা।
  3. সেবা ও যত্ন: বিশেষ করে বার্ধক্যে তাদের সেবা-যত্ন করা, তাদের প্রয়োজন পূরণ করা এবং তাদের আরাম-আয়েশের প্রতি খেয়াল রাখা।
  4. আর্থিক সহযোগিতা: পিতা-মাতার প্রয়োজন হলে তাদের জন্য খরচ করা সন্তানের দায়িত্ব। এমনকি সন্তান যাকাত দেওয়ার উপযুক্ত হলেও পিতা-মাতাকে যাকাত দেওয়া যায় না, কারণ তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব সন্তানের উপর বর্তায়।
  5. তাদের জন্য দোয়া করা: জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থাতেই পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। কুরআনে শেখানো হয়েছে এই দোয়া: "হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়া ও স্নেহের সাথে লালন-পালন করেছেন।" (সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৪)
  6. মৃত্যুর পর কর্তব্য: তাদের মৃত্যুর পর তাদের ওসিয়ত পূর্ণ করা, তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা।

উপসংহার

পিতা-মাতা হলেন দুনিয়াতে আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত। তাদের সেবা ও সম্মান করার মাধ্যমে একজন সন্তান দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই সফলতা অর্জন করতে পারে। তাদের অবাধ্যতা ও অসম্মান আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ এবং এটি একটি বড় কবিরা গুনাহ। আমাদের সকলের উচিত পিতা-মাতার মর্যাদা বোঝা এবং তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা, যাতে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করতে পারি।