Aid Islam LogoAid Islam

বাংলা আর্টিকেল

যাকাতের গুরুত্ব ও তার সামাজিক প্রভাব
প্রায় ১৮ মিনিট পঠন
যাকাত, অর্থনীতি, সমাজ, ইবাদত
পালকের কলম

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে যাকাত তৃতীয়, যা ঈমান ও সালাতের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যাকাত কেবল একটি আর্থিক ইবাদত নয়, এটি একটি সামগ্রিক জীবনব্যবস্থার অংশ যা মুসলিম সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। ‘যাকাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা, বৃদ্ধি এবং বরকত। পারিভাষিকভাবে, যাকাত বলতে বোঝায় প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর তার সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত ২.৫%) নির্ধারিত খাতে অসহায় ও দরিদ্রদের জন্য ব্যয় করা। এটি কোনো ঐচ্ছিক দান নয়, বরং এটি ধনীদের সম্পদে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত গরিবের অধিকার।

যাকাতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব

যাকাত আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ পালন করে, যা তার ঈমানের পূর্ণতা দান করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বহুবার সালাত কায়েমের সাথে সাথেই যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যা এর অপরিহার্যতা প্রমাণ করে।

"এবং তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু করো।" (সূরা আল-বাকারা, ২:৪৩)

যাকাতের মূল আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য হলো সম্পদ ও আত্মার পরিশুদ্ধি। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সম্পদের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলিম তার অন্তর থেকে সম্পদের লোভ, কৃপণতা এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত মোহ দূর করতে শেখে। এটি তাকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে শেখায় এবং এই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে যে, সমস্ত সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তা'আলা। তিনি যাকে ইচ্ছা সম্পদ দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা তা থেকে বঞ্চিত করেন।

  • আত্মার পরিশুদ্ধি: যাকাত কৃপণতার মতো আত্মার ব্যাধি থেকে মুক্তি দেয়। যখন একজন ব্যক্তি তার কষ্টার্জিত সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দেয়, তখন তার অন্তরে त्याग ও উদারতার মতো মহৎ গুণাবলি তৈরি হয়।
  • সম্পদের পবিত্রতা ও বৃদ্ধি: যাকাত শব্দের মধ্যেই বৃদ্ধির অর্থ নিহিত আছে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ সম্পদে বরকত দান করেন। বাহ্যিকভাবে সম্পদ কমে গেলেও এর বিনিময়ে আল্লাহ তার বান্দাকে দুনিয়া ও আখিরাতে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "দান করলে সম্পদ কমে না।" (সহীহ মুসলিম)
  • আল্লাহর নৈকট্য লাভ: যাকাত হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসার এক নিদর্শন। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করে, যা একজন মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
  • গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি: যাকাত বান্দার গুনাহ মোচন করে এবং তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। এটি আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার একটি মাধ্যম।

যাকাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

যাকাত اسلامی অর্থব্যবস্থার একটি অন্যতম ভিত্তি। এটি সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।

  1. সম্পদের আবর্তন (Circulation of Wealth): ইসলাম চায় সম্পদ যেন সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত না থাকে, বরং তা যেন সকল স্তরের মানুষের মধ্যে আবর্তিত হয়। যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ থেকে একটি অংশ দরিদ্রদের কাছে স্থানান্তরিত হয়, যা তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়। এর ফলে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকে। আল্লাহ বলেন, "...যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।" (সূরা হাশর, ৫৯:৭)
  2. দারিদ্র্য বিমোচন: যাকাতের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করা। যাকাতের অর্থ যখন অভাবী, মিসকিন ও দরিদ্রদের হাতে পৌঁছায়, তখন তারা তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে তারা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। একটি কার্যকর যাকাত ব্যবস্থাপনা একটি সমাজকে ধীরে ধীরে দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারে।
  3. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: যাকাত সমাজে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন করে। যখন দরিদ্রদের হাতে অর্থ থাকে, তখন সামাজিক অস্থিরতা, চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হ্রাস পায়। এর ফলে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠিত হয়, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
  4. বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদান: যাকাত অলস ও সঞ্চিত অর্থের উপর ধার্য হয়। এর ফলে সম্পদশালী ব্যক্তিরা তাদের অর্থ অলসভাবে ফেলে না রেখে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। কারণ, বিনিয়োগকৃত অর্থের উপর লাভ হলে সেখান থেকে যাকাত দেওয়া সহজ হয়। এর ফলে দেশে শিল্প ও ব্যবসার প্রসার ঘটে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

যাকাতের সামাজিক গুরুত্ব

যাকাত শুধু একটি অর্থনৈতিক বিধানই নয়, এটি মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করে।

  • সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা (Social Safety Net): যাকাত একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। সমাজের অক্ষম, বৃদ্ধ, বিধবা, এতিম এবং শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা যাকাতের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পায়, যা তাদেরকে একটি সম্মানজনক জীবনযাপনে সাহায্য করে।
  • ধনী ও গরিবের মধ্যে সেতুবন্ধন: যাকাত ধনী ও গরিবের মধ্যে সম্পর্ককে মজবুত করে। গরিবরা যখন ধনীদের কাছ থেকে সাহায্য পায়, তখন তাদের মধ্য থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও শ্রেণিবৈষম্যের অনুভূতি দূর হয়। অন্যদিকে, ধনীরাও গরিবদের প্রতি তাদের সামাজিক দায়িত্ব অনুভব করতে শেখে। এর ফলে একটি সহানুভূতিশীল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে।
  • সামাজিক ঐক্য ও সংহতি: যাকাত মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি করে। এটি মুসলিমদেরকে একটি দেহের মতো করে তোলে, যার এক অংশে আঘাত লাগলে অন্য অংশও ব্যথা অনুভব করে। যাকাতের মাধ্যমে মুসলিমরা একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসে, যা তাদের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।

যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা যাকাত বণ্টনের জন্য আটটি নির্দিষ্ট খাতের কথা উল্লেখ করেছেন। এই খাতগুলোর বাইরে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে না।

"সদকা (যাকাত) তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্যে। এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আত-তাওবা, ৯:৬০)

এই আটটি খাত হলো:

  1. ফকির: যাদের কিছুই নেই, যারা পুরোপুরি অন্যের উপর নির্ভরশীল।
  2. মিসকিন: যাদের সামান্য সম্পদ আছে, কিন্তু তা দিয়ে প্রয়োজন মেটে না।
  3. যাকাত আদায়কারী: যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত কর্মচারী।
  4. মু'আল্লাফাতি কুলুবুহুম: যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করা প্রয়োজন (নওমুসলিম)।
  5. দাসমুক্তি: দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য।
  6. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: যারা ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম।
  7. ফি সাবিলিল্লাহ: আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী বা যেকোনো দীনী কাজের জন্য।
  8. ইবনুস সাবিল: মুসাফির বা ভ্রমণকারী, যারা পথিমধ্যে বিপদগ্রস্ত ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

উপসংহার

যাকাত ইসলামের একটি অপরিহার্য বিধান, যা আধ্যাত্মিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক—প্রতিটি ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি একদিকে যেমন ব্যক্তিকে কৃপণতা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সাহায্য করে, তেমনই অন্যদিকে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সহানুভূতিশীল সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। যদি মুসলিম উম্মাহ সঠিকভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করতে পারে, তবে এটি বর্তমান বিশ্বের অনেক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার এক বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান হতে পারে। তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উচিত своевременно ও সঠিকভাবে যাকাত আদায় করে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা অর্জন করা।